শাহ সাহেব হুজুর রহ.-এর স্মারকগ্রন্থ প্রসঙ্গে কিছু কথা
শুরুতে একটি নুক্তা দিতে চাই : পূর্ণ জানা এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া শুধু ভাসা ভাসা জ্ঞানে বা কিছু শুনে এ নিয়ে কথাবার্তা বলা, ছড়াছড়ি করা একেবারেই অনুচিত। আমাদের শরিয়তে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের হেফাজত করুন!
আমাদের সেরেতাজ আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রহ.-এর ব্যক্তিত্ব নিয়ে নতুন করে কিছু বলতে চাই না। তাকে যারা দেখেছেন, বুঝেছেন, তারা একবাক্যে স্বীকার করবেন : তিনি ছিলেন একজন অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব; যার উপমা তিনি নিজেই। আমাদের সৌভাগ্য, এমন একজন মহান মনীষীর ছাত্রত্ব অর্জন করেছি এবং তার সান্নিধ্য গ্রহণ করেছি।
জামিয়া ইমদাদিয়া আমাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান। আমি যা একটু লেখালেখি করি, এর মালমশলা এখান থেকেই পেয়েছি এবং এখানকার পরিবেশ আমাকে কলম ধরতে উদীপ্ত করেছে। ছাত্রজীবনে আল-আতহার পাঠাগারের সাথে যুক্ত ছিলাম আমি আর সহপাঠী খাইরুল ইসলাম। লেখালেখির কাজে আমাদের ছোটাছুটি মুহতারাম উসতাজদের চোখে পড়ত। তারা আমাদের প্রশ্রয় দিতেন, উৎসাহিত করতেন। হয়তো এই সুবাদেই তারা আমাদের মতো আনাড়িদের হাতে এক মহান দায়িত্ব অর্পণ করেছেন : রইসুল জামিয়া, উসতাজুল আসাতিজা শাহ সাহেব হুজুর রহ.-এর স্মারকগ্রন্থ সংকলনের কাজ।
করোনার সময়টায় আমরা এ কাজ শুরু করি। সে বছরটা ছিল নিদারুণ ট্রাডেজিক। একের পর এক বড় বড় আলেম মনীষীগণ ইন্তেকাল করছেন। শাহ সাহেব হুজুরের ইন্তেকালের মাসখানেকের মধ্যেই জামিয়া কর্তৃপক্ষ তার ওপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। একটি বাস্তবায়ন কমিটিও গঠিত হয়। সেখানে জামিয়ার সম্মানিত মুহতামিম শাব্বির আহমাদ রশিদ সাহেব, শাইখুল হাদিস শফিকুর রহমান জালালাবাদী সাহেব, শাইখুল হাদিস ইমদাদুল্লাহ সাহেব, মুফতি ওমর আহমদ সাহেব, হাফেজ মাওলানা শোয়াইব সাহেব, মাওলানা মাজহার সাহেব প্রমুখ ছিলেন। তারাই আমাদের বিভিন্ন কাজের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তদারকি করেছেন।
সেই বছর আমরা স্মারকের উল্লেখযোগ্য লেখাগুলো সংগ্রহ করি। এরমধ্যে আল্লামা আহমদ শফী, আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী, মুফতি ওয়াক্কাস রহ. প্রমুখের লেখা রয়েছে। আমরা সচেষ্ট ছিলাম, আমাদের লেখকতালিকায় যাদের নাম ছিল, প্রত্যেকের থেকে লেখা বা সাক্ষাৎকার নেওয়ার। এই তালিকায় হুজুরের পরিবার, ছাত্র-মুহিব্বিন, সমসাময়িক ব্যক্তিবর্গ অনেকেই ছিলেন। কিন্তু তখন দেশের পরিস্থিতি ছিল নাজুক, রাজনৈতিক অস্থিরতাও ছিল। তবুও আমরা প্রত্যেকের সাথে যোগাযোগ করেছি। দাওয়াত কার্ড পৌঁছে দিয়েছি। তারপরও অনেকের থেকে লেখা বা সাক্ষাৎকার গ্রহণ সম্ভব হয়নি।
এমনও হয়েছে, আমরা সাক্ষাৎ করতে যাব, যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি ইন্তেকাল করেছেন কিংবা সরকারের রোষানলে পড়ে গ্রেফতার হয়েছেন। আবার এমনও হয়েছে, স্মারকের দাওয়াত কার্ড নিয়ে আমরা গিয়েছি। তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন লেখা দেবেন। কিন্তু তিনদিন ঘোরাঘুরি এবং সারাদিন অপেক্ষায় থেকেও তার লেখা বা সাক্ষাৎকার পাইনি। আবার অনেকে আশ্বাস দিয়েও শেষ সময়ে অপারগতা প্রকাশ করেছেন কিংবা কাঙ্খিত লেখাটি দেননি। আর বেশি যেটা হয়েছে, অনেকেই লেখা পাঠিয়েছেন হুজুরের সংক্ষিপ্ত জীবনিকার কপি করে। এ কারণে তাদের লেখা গৃহীত হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে আড়াই বছর কাজের পর স্মারকের একটা সমৃদ্ধ রূপ দাঁড়াল। আমরা আমাদের সবটুকু দিয়ে কাজটা শেষ করে হুজুরদের হাতে সমর্পণ করে বিদায় নিলাম। এরপরই প্রতিষ্ঠান এটা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর প্রাতিষ্ঠানিক কাজের কারণে এটা প্রকাশ পেতে একটু সময় লেগে যায়। এ ব্যাপারে হুজুরদের ভেতরেও তাড়না ছিল : কাজটা তাড়াতাড়ি প্রকাশিত হোক। কিন্তু পারিপার্শ্বিক নানা কারণে ইচ্ছা থাকার পরও একটু বিলম্ব হয়ে যায়।
অবশেষে স্মারকগ্রন্থটি আলোর মুখ দেখছে। এটা আমাদের সকলের জন্যই আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের বিষয়। হুজুররা এ উপলক্ষ্যে একটি মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছেন। দেশের প্রথিতযশা প্রকাশনা মাকতাবাতুল আযহার আছে স্মারকের পরিবেশক হিসেবে। বানিয়ে জামিয়া আল্লামা আতহার আলী রহ.-এর জীবনীগ্রন্থ হায়াতে আতহার-এর নতুন সংস্করণেরও পরিবেশক তারা।
স্মারকের কাজ নব্বই ভাগ গোছানো ছিল। কিছু কাজ ছিল প্রক্রিয়াধীন। এগুলো পূর্বের ফাইলে যায়নি। আলাদা ফাইলে ছিল। এ অবস্থায় পূর্বের ফাইলটি প্রকাশের জন্য চলে যায়। এটা অবশ্যই মিস্টেক। মানুষমাত্রই এমন ভুলচুক করে থাকে। আর এ অবস্থায় স্মারকের কিছু কপি বাজারে চলে আসে। স্মারক কর্তৃপক্ষ এবং আমরাও এজন্য অত্যন্ত লজ্জিত ও বিব্রতবোধ করছি। সকলের সদয় অবগতির জন্য জানিয়ে রাখছি : এটা পূর্ণাঙ্গ স্মারকগ্রন্থ নয়। সেই স্মারকটি প্রক্রিয়াধীন লেখাগুলো-সহ বাজারে আসবে। তখন বিজ্ঞ পাঠকদের নজরে যদি কোনো অসঙ্গতি বা অসুন্দর বিষয় ধরা পড়ে, তাহলে কর্তৃপক্ষকে জানানোর অনুরোধ। পরবর্তী সংস্করণে সব শোধরানো হবে, ইনশাআল্লাহ।
আরেকটি বিষয় না বলে পারছি না : যেখানে স্মারকের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান এখনো হয়নি, সেখানে স্মারকের নমুনা প্রকাশিত হয়ে যাওয়া কিংবা এ নিয়ে বদনামের ছড়াছড়ি করাটা খুবই দৃষ্টিকটু দেখায়। তাই ফেসবুকে এ নিয়ে যেটা হচ্ছে, এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হচ্ছে। আমার এবং খাইরুল ইসলামের নাম না থাকা নিয়ে অনেকে কথা বলছেন। স্মারকে আমাদের সংশ্লিষ্টতা আছে মানে আমাদের নাম অবশ্যই থাকবে। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টা তদারকি করেছেন। সবাই সুন্দর একটা স্মারক হাতে পাবেন, ইনশাআল্লাহ!
তাই সকলের কাছে আমাদের অনুরোধ, এ বিষয়টা নিয়ে দয়া করে আর কেউ জল ঘোলা করবেন না। ভুলচুক কিছু নজরে পড়লে এটা কর্তৃপক্ষকে সুন্দরভাবে অবগত করুন। তারা শোধরানোর উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু দয়া করে এ নিয়ে অমূলক কথাবার্তা বা মিথ্যার ছড়াছড়ি করবেন না। আর এ বিষয়ে আমাদেরকেও জিজ্ঞাসার মুখোমুখি করবেন না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সুমতি দান করুন!
ফেসবুক পোস্টে মুজিব হাসান।

