ঢাকাFriday , 12 June 2026
  1. আর্ন্তজাতিক
  2. ইসলাম
  3. বিনোদন
  4. রাজনীতি
  5. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জাতীয় বাজেট ভাবনা: সাধারণ মানুষের জীবনমান এবং আগামীর রূপরেখা

প্রতিবেদক
alhadi
June 12, 2026 6:31 am
Link Copied!

জাতীয় বাজেট ভাবনা: সাধারণ মানুষের জীবনমান এবং আগামীর রূপরেখা

আমরা প্রায়ই বাজেটের কথা শুনি। টেলিভিশন, পত্রিকা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের অনেকেই জানেন না, বাজেট আসলে কী এবং এটি আমাদের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে!
বিষয়টি খুব সহজ। একটি পরিবার যেমন মাসের শুরুতে ঠিক করে নেয় তার আয় কোথায় ব্যয় হবে, একটি রাষ্ট্রও তেমনি আগাম পরিকল্পনা করে আগামী এক বছরে কত টাকা আয় করবে এবং কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করবে। এই পরিকল্পনাকেই বলা হয় জাতীয় বাজেট।
সাধারণ আলেম সমাজের অর্থনৈতিক দর্শন অনুযায়ী বাজেট হচ্ছে আগামীর রাষ্ট্র কেমন হবে, তার একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা। বাজেট রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলিল নয়, এটা এই দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবনমানের প্রতিচ্ছবি। ইসলামি অর্থনীতির পরিভাষায় এটি হলো বাইতুল মালের ন্যায়সংগত ব্যবস্থাপনার বার্ষিক ঘোষণা। তাই বাজেট প্রণয়নে আমাদের দর্শন হলো, মাকাসিদে শরিয়াহ—দ্বীন, জীবন, বুদ্ধিমত্তা, বংশধারা ও সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা।
জাতীয় বাজেট এই পাঁচটি মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হলে সেটা রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা। তাই আমরা বলি, মাকাসিদে শারিয়াহর মানদণ্ড, অংশগ্রহণমূলক রাজস্ব নীতিমালা ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামো নিশ্চিত করাই একটি বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
একটি ভালো বাজেট রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, দর্শন ও ভবিষ্যত পরিকল্পনার প্রতিফলন। তাই সরকার কোন বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, জনগণের কোন সমস্যাকে আগে সমাধান করতে চায় এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চায়—এসবের উত্তর লুকিয়ে থাকে বাজেটের মধ্যেই।
বাংলাদেশের বাজেটের ইতিহাস দীর্ঘ। স্বাধীনতার পর ছোট আকারের বাজেট দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও আজ বাজেটের পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু বাজেটের আকার বড় হলেই যে মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, এমন কোনো কথা নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো, টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে এবং সেই ব্যয়ের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে কিনা?
গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় ঋণের সুদ পরিশোধেই বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায়। যে অর্থ উৎপাদন, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ হওয়ার কথা ছিল, তার বড় অংশ ঋণ পরিশোধে চলে যায়। তার উপর যে বাজেট ঘোষণা করা হয়, তা বাস্তবায়নের হার সন্তোষজনক নয়। দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে জনগণের কষ্টার্জিত করের অর্থের বড় অংশ কার্যকর কাজে ব্যয় হয় না।
সবচেয়ে না-ইনসাফির কথা হলো, বাজেটের বড় আয়টি তুলে আনতে হয় মূল্য সংযোজন কর থেকে, অর্থাৎ কর আদায়ের বড় অংশটি হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভ্যাট-ট্যাক্স।
একটা সাবান, চাল বা তেলের প্যাকেট কিনলে একজন রিকশাচালক/দিনমজুর যে টাকা ভ্যাট দেন, দেশের বড় কোটিপতিও একই টাকা ভ্যাট দেন। এই ব্যবস্থাটি গরিবের জন্য অত্যন্ত অন্যায্য। অথচ হওয়া উচিত ধনীদের থেকে কর নাও এবং গরিবদের স্বস্তি দাও।
আমাদের দেশে মেগা-প্রজেক্ট বা বড় বড় দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরিতে সরকার যত টাকা খরচ করে, তার তুলনায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মূল দুটি জায়গা—শিক্ষা ও চিকিৎসায় বরাদ্দ অনেক কম থাকে। সাধারণ মানুষের দাবি, এই অনুৎপাদনশীল খাতের অপচয় কমিয়ে সরকারি হাসপাতাল ও স্কুল-কলেজের মান বাড়াতে বেশি টাকা খরচ করা হোক।
গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, যে হারে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, সেই হারে কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না। অথচ করমুক্ত আয়ের সীমা খুব একটা বাড়ানো হয় না। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো করের চাপে পিষ্ট হচ্ছে। বাজেট হওয়া উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা রাখার হাতিয়ার।
একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত মানুষের ওপর। কারণ কোনো দেশের প্রকৃত সম্পদ তার মানুষ। দক্ষ, শিক্ষিত এবং সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধ হতে পারে না। তাই বাজেটে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু সার্টিফিকেটের কাগুজে শিক্ষা নয়, প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রকে বড় বিনিয়োগ করতে হবে।
একইভাবে স্বাস্থ্য খাতও জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। একজন অসুস্থ মানুষ যেমন নিজের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে না, তেমনি অসুস্থ জনগোষ্ঠী নিয়ে কোনো রাষ্ট্রও এগোতে পারে না। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসার মান, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, কৃষি গবেষণা এবং খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট বাড়তেই থাকবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, নতুন উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এবং উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি নিরাপত্তা সক্ষমতাও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। সীমান্ত সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, সমুদ্রসম্পদ রক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
জ্বালানি নিরাপত্তাও আজকের বিশ্বের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প, কৃষি, পরিবহন—সবকিছুই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর। তাই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং অপচয় কমানোর উদ্যোগ বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনের জন্য স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন দিয়ে পুরো দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। উন্নয়নের সুফল তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজেট যত বড়ই হোক, যদি দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করা না যায়, তাহলে জনগণ তার সুফল পাবে না। জনগণের করের টাকা জনগণের কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর তদারকি অপরিহার্য।
অর্থ খরচ করতে পারাটা ভালো বাজেটের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত না। বাজেটের উদ্দেশ্য হবে এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ দক্ষ হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, কৃষি শক্তিশালী হবে, স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হবে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে। অর্থাৎ বাজেট হচ্ছে একটি জাতির ভবিষ্যত গড়ার রূপরেখা।
যে বাজেট মানুষের ওপর বিনিয়োগ করে, উৎপাদনকে উৎসাহিত করে এবং রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে, সেই বাজেটই প্রকৃত অর্থে সফল বাজেট।

 

  • -রিদওয়ান হাসান
    মুখপাত্র: সাধারন আলেম সমাজ